"বংশের আলো"
(শেষ অংশ)
প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে তীব্র দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো রেহনুমার দিকে আরশি। আর ওদিকে রেহনুমা একবার মাহতাবের মুখের দিকে, একবার আরশির মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। দৃষ্টি বিহ্বল, মুখের প্রতিটা রেখায় ফুটে উঠেছে হতভম্ব অবস্থা উনার মনের। যা কোনদিন কল্পনা করাও প্রয়োজন হয় নি, আজ সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আরশি। উনার সারাজীবনের বিশ্বাস, আত্মতৃপ্তি, অহমিকা, সব কিছুই কাঠগড়ায় দাঁড়ানো যেন। বংশ তো বংশই হয়! আর সেটা প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে নিয়ে চলে তার পুরুষ উত্তরাধিকার। কিন্তু কিসের যোগ্যতায় বংশধারা বজায় রাখার জন্য এই প্রচন্ড প্রচেষ্টা, সেটা তো কোনদিন ভেবে দেখেন নাই!
উনার অবস্থাটা একটু উপভোগ করলো আরশি ৩০ সেকেন্ড। তারপর আবার জোর করলো, "কই বলুন!... সারাক্ষণ তো আমার ছোট বংশ, ছোট জাতের কথা তুলে খোঁটা শোনান... তা আপনার বংশের গরিমা কারা কারা রক্ষা করেছেন আমাদের বলবেন না? না বললে বুঝবো কি করে? আমার সামনে এই বংশের প্রদীপের তো নমুনা বলতে এই একজন!", বলে হাত তুলে মাহতাবকে দেখালো ও। মাহতাবের মনে হলো মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। ১০ বছরের অপমান, অবমাননার শোধ যে আরশি এভাবে তুলবে তা ও দুঃস্বপ্নেও চিন্তা করে নি কোনদিন। ভাবতে পারলে আজকের এই দিন দেখতে হতো না।
সারোয়ার সাহেব আবার বললেন, "আরশি... বাদ দে মা... তোর গোছগাছ সব হয়ে গেলে বের হওয়ার জন্য তৈরি হ... এগুলো নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি করিস না..."।
আরশি বললো, "তা হয় না বড়মামা!... উনাদের কোনও কথারই কোনও জবাব কোনদিন আমি দেই নি... কথা না বললে পরিষ্কার হবো কি করে?... মা! বললেন না? ... তা এই যে একজনকে উপহার দিয়েছেন আপনি সমাজকে... সে মন্দ লোক নয় এটুকু ক্রেডিট আমি তাকে দিতেই পারি... আজকের দিনে সৎ, সাধারণ ভালো মানুষই বা কোথায় পাওয়া যায়, তাই না? সেটাও তো আরেকটু হলে আমার গায়ে হাত তুলতে গিয়ে খোয়াতে বসেছিলো!... এতোক্ষণে স্ত্রী-নির্যাতনকারী পুরুষের লিস্টে নাম উঠে যেতো... সে ভালো মানুষ হলেও ভালো স্বামী সে হতে পারে নি... যে স্বামী স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা না করে, স্ত্রীর মৃত্যু হতে পারে জেনেও একের পর এক সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য জোরাজুরি করে, স্রেফ একটা ছেলে সন্তানের জন্য, সে আর যাই হোক স্ত্রীকে স্ত্রীর মর্যাদা যেমন দিতে শেখে নি, স্ত্রীর কাছেও উত্তম স্বামীর সার্টিফিকেট সে পেতে পারে না... ভালো সন্তান সে কিনা সে বিচার আমি আপনার উপর ছেড়ে দেবো... আর ভালো বাবা হওয়ার সুযোগ তার এখনও ফুরিয়ে যায় নি... কিন্তু... এর বাইরে? কি বিশেষত্ব তার? কি ক্যারিশম্যাটিক কোয়ালিটি তার আছে?... আপনার চোখে সে অসাধারণ... বুঝলাম... সেটা সব মায়ের চোখেই তার সন্তানেরা হয়... আপনার কাছে আপনার ছেলে যেমন... আমার কাছে আমার মেয়েরাও তেমনই অসাধারণ... মা হয়ে এটুকু আমি বুঝি... প্রতিটা মানুষ চায় দুনিয়াতে নিজের একটা সন্তান আনতে... নিজের একটা অংশকে নতুন একটা মানুষের আদলে বেড়ে উঠতে দেখতে... এবং সেই সন্তানের দিকে ধেয়ে যায় তার স্নেহ... এটা ন্যাচারাল রিজেনারেশন-এর প্রসেস এবং সাইকোলজি... কিন্তু বংশের গতি হওয়াটা এতো জরুরী কেন? তাও ছেলে সন্তান দিয়েই? এমন যদি হতো যে সে সন্তানের বাবা হতেই পারে নি, তাও নাহয় আমি বুঝতাম যে আহা!... বাবা হওয়ার বিশেষ ইচ্ছা ছিলো, হতে পারলো না... বাট হোয়াই বংশের গতি? হোয়াই বংশের বাতি?... সন্তান হওয়া আর বংশ রক্ষার মধ্যে কোনও পার্থক্য তো আমি দেখি না... পার্থক্য করেন আপনারা... ছেলে আর মেয়ে হওয়া দিয়ে... তাই আপনাকেই জিজ্ঞেস করছি..."।
থামলো আরশি। রেহনুমা বোধহয় কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু তাঁর গলা দিয়ে কিছুটা গোঁ গোঁ জাতীয় একটা আওয়াজ ছাড়া আর কোনও পূর্ণ শব্দ বেরুলো না। ঘরের সব ক'টা চোখ আরশির দিকে। এতোগুলো মানুষের জীবনভর আঁকড়ে ধরে রাখা বিশ্বাস, ভাবনার গোড়ায় আঘাত করে চলেছে আরশি একের পর এক। যে ভাবনা, যে বিশ্বাসকে এরা কেউ কোনদিন প্রশ্ন করার কথা ভাবেই নি! চিন্তাও করে নি যে এর বাইরেও কিছু ভাবার থাকতে পারে, চিন্তা করার থাকতে পারে। আরশি দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলো, "আর এই যে এই টাক মাথা, ৪০ বছর বয়স... সামনের দিকে বাড়ানো ভুঁড়ি... এগুলোসহ আপনি আবার তার বিয়ের কথাও বড় গলায় বলে যাচ্ছেন... একজন ৪০ বছর বয়স্ক ডিভোর্সি, ৩ বাচ্চার বাপকে বিয়ে করাবেন আপনি? কোনও রুচিশীল, সঙ্গতি আছে এমন পরিবারের মেয়ে আপনি পাবেন কিনা নিজেকেই প্রশ্ন করুন... হ্যাঁ পাবেন!... যেসমস্ত পরিবারে আপনার মতোই মেয়েদেরকে ময়লার বালতি মনে করে আর বাথরুমের ঝাঁটার মতো ব্যবহার করে... সেরকম কোনও পরিবার থেকে মেয়ে বিদায় করে তারা হয়তো বোঝা নামাবে..."। কথা থামিয়ে শব্দ করে হেসে উঠলো আরশি, হাসতে হাসতেই বললো, "আমার মায়ের আরও একটা মেয়ে থাকলে ভালো হতো অবশ্য... আপনার পাত্রী খোঁজার ঝামেলা কমলেও কমতে পারতো..."।ফ্যামিলি ট্যুর প্যাকেজ
***
আরশি হেসেই চলেছ�
.jpeg)
Comments
Post a Comment